নূরুল হুদা নাহিদ

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি প্রকল্পে নারী কর্মী নিয়োগের লটারি ঘিরে চরম বৈষম্য ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একই প্রকল্প ও অভিন্ন পদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উপজেলার চারটি ইউনিয়নে চার ধরনের নিয়ম খাটানোর খবর পাওয়া গেছে। কোথাও ওয়ার্ডভিত্তিক, কোথাও ইউপি সদস্য ছাড়া, কোথাও পুরো ইউনিয়ন মিলে একসঙ্গে লটারি করা হচ্ছে। আবার কোথাও জনপ্রতিনিধিদের আপত্তিতে প্রক্রিয়া স্থগিত হলেও, অন্য ইউনিয়নে সেই একই আপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লটারি শেষ করার ঘটনা ঘটেছে। এলজিইডির ‘পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প’ (আরইআরএমপি)-র এই লটারি কাণ্ড নিয়ে বর্তমানে এলাকাজুড়ে তোলপাড় চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর গজঘণ্টা ইউনিয়নে সম্পূর্ণ ওয়ার্ডভিত্তিক আলাদা আলাদা লটারি সম্পন্ন করা হয়।
তারপর ২৯ অক্টোবর নোহালি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আশরাফ আলীর একক আধিপত্যে তড়িঘড়ি করে লটারি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ইউপি সদস্য। তারা অভিযোগ করে বলেন মাইকিং তো দূরের কথা আমরা কেউ জানিও না। আমরা ইউপি সদস্য ঠিক আছে, কিন্তু বাড়ি চর এলাকায় হওয়ায় আমাদের নাকি সেখানে উপস্থিত থাকারও কোনো অধিকার নেই।এর আগে একদিন আমাদের বললেও লটারির দিন আমাদের আর ডাকে নাই।আমরা তো ইউনিয়ন পরিষদের বডির সদস্য তাহলে আমাদের অধিকারটা কোথায়। এ ছয়-নয় লটারি বাতিল চাই।
এর চার দিন পর আজ ১ নভেম্বর সকালে আলমবিদিতর ইউনিয়ন পরিষদে পুরো ইউনিয়নের সকল আবেদনকারীকে এক জায়গায় জড়ো করে লটারি করার উদ্যোগ নেন এলজিইডির কর্মকর্তারা। তবে এই নিয়মে বৈষম্য তৈরি হবে উল্লেখ করে তীব্র আপত্তি জানান উপস্থিত ইউপি সদস্যরা। তাঁদের বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত লটারি না করেই ফিরে যেতে বাধ্য হন উপসহকারী প্রকৌশলী মামুন মিয়া, কমিউনিটি অর্গানাইজার মো. ফিরোজ মামুন এবং উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের সার্ভেয়ার মো. পারভেজ মাহমুদসহ সংশ্লিষ্টরা।
অথচ একই দিনে পাশের কোলকোন্দ ইউনিয়নে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা গেছে। সেখানেও ইউপি সদস্যরা একই ধরনের বৈষম্যমূলক পদ্ধতির প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের সেই আপত্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পুরো ইউনিয়নের আবেদনকারীদের নিয়ে একতরফাভাবে লটারি সম্পন্ন করেন এলজিইডির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। একই প্রকল্পে একেক ইউনিয়নে একেক নীতি কেন- তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নোহালী ইউপি সদস্য বুলেট জানান, বৈষম্যের শেষ নেই আমাদের ইউনিয়ন টাতে। বারবার অপমান আর হেনস্তায় আর ইজ্জত বাছে না। অভিযোগ যে দেবো এলজিডি কর্মকর্তারও ঐ একই বয়ান।আগে অনেক কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছি এরকম ছিল না। উনার কথার যে পাওয়ার যেনো আমরা কিছুই জানিনা,যা জানে সব উনিই জানে।

আলমবিদিতর ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একই সরকারি প্রকল্পে এক এক জায়গায় এক এক নিয়ম কেন খাটানো হচ্ছে? কোনো ইউনিয়নে ওয়ার্ড ধরে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও পুরো ইউনিয়নকে একসঙ্গে ফেলে আবেদনকারীদের ঠকানো হচ্ছে। এভাবে চললে গরিব নারীদের মধ্যে চরম বৈষম্য তৈরি হবে। আমরা চাই সব ইউনিয়নে একই নিয়ম মেনে স্বচ্ছভাবে কর্মী বাছাই করা হোক।”
একই সুর কোলকোন্দ ইউপি সদস্য হুমায়ুন কবির লালের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “আমাদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও জোর করে পুরো ইউনিয়নের লটারি একসঙ্গে করা হলো। অথচ অন্য ইউনিয়নে ভিন্ন পদ্ধতি চলছে। একই প্রকল্পে ইউনিয়নভেদে এমন দ্বিমুখী আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কর্মী নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকৌশলী জয়া সান্যাল জানান, নোহালী ইউনিয়নে একদম প্রজ্ঞাপন অনুসারে লটারি সম্পন্ন হয়েছে,পাঁকা রাস্তার আশেপাশের ইউপি সদস্যের প্রয়োজন, এজন্য চরের ইউপি সদস্যদের জানাননি চেয়ারম্যান উনি সেটা আমাকে জানিয়েছেন। “আলমবিদিতর ইউনিয়নে বাধার মুখে লটারি বন্ধ হয়নি, কিছুটা সমস্যা তৈরি হওয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থে তা স্থগিত করা হয়েছে। কোলকোন্দ ইউনিয়নে আমাদের টিম কাজ করে লটারি শেষ করেছে।” তবে গজঘণ্টা ইউনিয়নে ভিন্ন নিয়মের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “সেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে নিয়োগকারী কর্মকর্তা ওয়ার্ডভিত্তিক লটারি দিয়েছিলেন।”
একই সরকারি প্রকল্পে নারী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এই 'চতুর্মুখী ' নীতি এবং নিজস্ব খেয়ালখুশিমতো কোথাও স্থগিত ও কোথাও জোরপূর্বক লটারি সম্পন্ন করায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। ভুক্তভোগী ও আবেদনকারীদের দাবি, নিয়োগে সব ধরণের বৈষম্য দূর করতে অনতিবিলম্বে অভিন্ন ও স্পষ্ট নীতিমালা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।